কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্যবহার এবং কিছু কথা


বিশেষজ্ঞরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছিলেন যে মানুষের বিভিন্ন কাজরে জায়গা একসময় মানুষের বিকল্প কোন রোবট কিংবা মেশিন দখল করে নিবে। অবশ্য এখন হয়েছেও তাই, যেমন ধরুন, আপনি একটি রেস্টুরেন্টে গেলেন আপনার সামনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে খাবারের মেনু চলে আসবে প্রত্যেকটি মেনুর আলাদা মূল্যসহ, এছাড়া মানবিকতার কায়িক শ্রমের পরিবর্তে দখল করে নিয়েছে বিশাল বিশাল অটো যন্ত্র যা মানুষের জীবনকে অনেকাংশে সহজ করে দিয়েছে। আমরা কথা বলছি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা Artificial Intelligence (AI) নিয়ে।
মানব মস্তিস্কের চরম উন্নতি আর প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার মানুষকে যেমনি উন্নত জীবনে চলার পথকে সমুন্নত করেছে তেমনি অনেক মানুষের জন্য তাদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কী?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো আধুনিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের একটি বিশেষ এবং সুবিস্তৃত শাখা যেখানে স্মার্ট মেশিনারিজ ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে মানুষের কাজের মত হুবহু কাজ করতে সক্ষম এমন উপায়। প্রযুক্তির বহু খাতে বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক ব্যবহার লক্ষনীয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু যে রোবটকে কাজে লাগিয়ে করা হচ্ছে তা কিন্তু নয়। বলা যেতে পারে মানুষের বুদ্ধিমত্তার বিকল্প ব্যবহার। তবে Data Robot এর CEO Jeremy Achin (2017) এর মতে “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো কম্পিউটার সিস্টেমের মাধ্যমে সম্পাদিত কর্ম যাতে সাধারণত মানব বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন হয়। তিনি আরো বলেন, কিছু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মেশিন লার্নিং, কিছু ডিপ লার্নিং এবং কিছু একঘেয়েমি টাইপের রুল সহযোগে পরিচালিত হয়। সহজে বলা যেতে পারে যন্ত্রের বুদ্ধিই হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানব সৃষ্ট। প্রথম প্রশ্ন ছিলো যন্ত্র কি মানুষের মত কাজ করতে পারে, ভাবতে পারে এমনকি মানুষের ডাকে সাড়া দিতে পারে, কিংবা মানুষের গতিবিধি লক্ষ্য করতে পারে? এখন তো দেখা যাচ্ছে সবই পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগানো হয় সাধারণত বিশ্লেষণধর্মী কাজ (Analytical jobs) এবং সমস্যা সমাধানকল্পে (Problem solving)। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বহুবিধ ব্যবহার নিম্নরুপে উত্থাপন করা হলোঃ-
১. রোগ নির্ণয় ও বর্ণনা এবং আগাম তথ্যপ্রদান
২. উৎপাদন কার্যসম্পাদন ও ড্রোন রোবট
৩. অনুকূল ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য চিকিৎসা এবং সুপারিশসমূহ
৪. কাস্টমার কেয়ার সার্ভিস
৫. স্টক ট্রেডিং
৬. ইমেইলে স্পাম ফিল্টারিং
৭. সামাজিক যোগাযোগ মাধম্যে বিভিন্ন ধরণের টুলের ব্যবহার
উপরোক্ত বিষয়গুলো কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা’র ব্যবহার। নিম্নে কৃত্রিম সংকীর্ণ বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার উল্লেখ করা হলোঃ-
১. গুগল সার্চ
২. ছবি রিকোগনিশান সফটওয়্যার
৩. ভার্চূয়াল সহকারী
৪. চালকবিহীন গাড়ী
৫. মানুষের গতিবিধি লক্ষ্য করা
৬. মানুষের অবস্থান ডিটেক্ট করাও সম্ভব হচ্ছে
তাছাড়া বাসা-বাড়ী, অফিস কিংবা কারখানা এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও তালাবদ্ধ কিংবা খোলা সবই সম্ভব।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিহাস
কেউ কেউ দাবি করে থাকেন পুরাতন গ্রীক পুরাণে কাল্পনিক কাহিনীর মত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তারও প্রথম পরিচয় মেলে। তবে আধুনিক সময়ে আমরা যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উদ্ভব এবং ব্যবহার দেখতে পাচ্ছি তার বয়স কিন্তু একশত বছরও হয়নি। বড় ধরণের ব্যবহার আমরা দেখতে পাচ্ছি ১৯৮২ সালে জাপানে তাদের উৎপাদন কার্যে উচ্চ কাঙ্ক্ষিত পঞ্চম প্রজন্মের কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে। এরপর বেশ কিছু বিষয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং গবেষণা নিয়ে মোটামুটি বিপ্লব চলতে থাকে। তারপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ২০০৮ সালে গুগল আই ফোন এ্যাপসে স্পিচ রিকোগনিশান করতে সক্ষম হয়। এরপর আরেকটি বড় সাফল্য আসে অবশ্য গুগলের হাত ধরেই ২০১৪ সালে সেটি হলো চালক বিহীন গাড়ী চালনার পরীক্ষা করে এবং লক্ষ্য করা গেছে মানব চালকের চেয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে সংগঠিত দূর্ঘটনার সংখ্যা কম। তবে আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক কে? উত্তরে বলা যেতে পারে জন ম্যাকার্থি। ১৯৫৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উদ্ভব ঘটে। আবার কেউ কেউ এলান টিউরিংক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক বলে থাকেন। সেটা অবশ্য ১৯৫০ সালের কথা।

ইতিহাস হয়ত ভিন্ন ভাবে লেখা যেতে পারে। তবে সব কিছু ইতিহাসে স্থান বা অবস্থান নিয়েও কিন্তু কম রাজনীতি হয়না। যাই হোক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আমরা ইতিহাস ঘাটলে দেখতে পাবো বিভিন্ন ধরণের বিতর্ক, আলোচনা, সমালোচনা। যন্ত্র যখন মানুষের মত বুদ্ধি নিয়ে তার কাজ সম্পাদন করে তখন তাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বলা হয়। আগামী দিনে মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে হয়ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সিংহ ভাগ দখল করে নিবে। তবে আমরা মনে করি মানুষ যেহেতু স্রষ্টার সেরা সৃষ্টি তাই কখনো তা মানুষের জায়গা সম্পূর্ণ দখল করতে পারবে না। তবে আল্লাহ যতটুকু স্বাধীনতা বর্ধিত করবেন তা ব্যতিত।
ভবিষ্যত চাকরীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব
এটা দৃশ্যমান যে মানুষের অনেক চাকরী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দখল করে নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরো অনেক চাকরী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দখল করে নিবে, সেটা হতে পারে পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে, এটা বিশেষজ্ঞদের ধারণা। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গুরু হিসেবে পরিচিত কাই-ফু লি, সিইও (সিনোভেইশান ভেনচারস) এবং “AI Superpowers: China, Silicon Valley, and the New World Order” গ্রণ্থের লেখক অবশ্য বলেছেন, আগামী পনের বছরের মধ্যে মানুষের দ্বারা সম্পাদিত কাজ এর পঞ্চাশ শতাংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পাদিত হবে। অনেক মনীষাদের মতে বর্তমান শতাব্দাী হলো চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এবং এটি বহুল আলোচিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক প্রয়োগের ফল। এটি মহাগ্রন্থ আল কুরআনের ভাষ্যমতে মানুষ খুবই দ্রুতপ্রবণতা প্রিয় আর সে কারণেই হয়ত কৃত্রিম বদ্ধিমত্তার এতো ব্যবহার চোখে পড়ে। তবে আমাদের মত দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বেড়ে চলেছে আর পশ্চিমাদের আদলে গড়তে অবশ্য একটু সময় লাগতে পারে।
প্রশ্ন হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কী মানব সভ্যতার জন্য হুমকিস্বরুপ?
বিবিসি উল্লেখ করেছে স্টিফেন হকিং থেকে শুরু করে ইলন মাস্ক-বিশ্বের শীর্ষ কয়েকজন বিজ্ঞানী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, এটি এক সময় হয়তো মানব প্রজাতির জন্য একটি হুমকি হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু নতুন একটি বইতে বলা হচ্ছে, রোবট আসলে নিজে থেকে সচেতন হয়ে উঠছে না বা তাদের মানুষ প্রভুর বিরুদ্ধে কোন মনোভাব তৈরি করছে না, যেটি মানুষের জন্য ভয়ের কারণ হতে পারে। আসলে এসব যন্ত্রের জন্য নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে এগুলো এতোটাই দক্ষ হয়ে উঠছে যে, হয়তো দুর্ঘটনাবশত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে তাদের ভুল কোন কাজে লাগানোর মাধ্যমেই আমাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে পারে।
উপসংহার
একথা সর্বজন বিদীত যে অবশ্যই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবমন্ডলীর প্রভুত কল্যাণ সাধন করে যাচ্ছে। যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে আপনি আপনার লেখা উন্নত করতে পারবেন ব্যাকরণ চেকিং থেকে শুরু করে বাক্য গঠন এবং আরো উচ্চ পর্যায়ের অনেক শুদ্ধকরণ, বিগ ডেইটা বিশ্লেষণ, এইচআর কিংবা এ্যাডমিনিস্ট্রেশানের অনেক কাজ আপনি করতে পারবেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে। শুধু তাইনা শিল্পকারখাগুলোতে অনেক কাজ করা সম্ভব মানুষ ছাড়া। তাছাড়া কেউ কেউ বলছেন যে আগামীর ভবিষ্যত মেশিন বনাম হিউমান হবে তা কিন্তু নয় বরং তা হবে উভয়ের কাজকে আরো কিভাবে উন্নত করা যায় কিংবা ভিন্ন উপায়ে করা যায় তা নিয়ে। তবে এটি নিঃসন্দেহে একটি দানবীয় ব্যাপার এর চেয়েও বেশি কিছু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

artificial-intelligence